লাভবার্ড পাখি সম্পর্কে বিস্তারিত এবং পাখি পালন পদ্ধতি
লাভবার্ড তোতাপাখি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত জনপ্রিয় পোষা পাখি। লাভবার্ড তাদের উজ্জ্বল রং, চঞ্চল স্বভাব এবং আনন্দপূর্ণ আচরণের জন্য বিখ্যাত। লাভবার্ড এর প্রজাতিক নাম “আগাপোরনিস”। গ্রিক ভাষায় আগাপেইন হলো (Agapein) “to love” ও ওর্নিস (Ornis) হলো ল্যাটিন শব্দ “বার্ড”। লাভবার্ডের গড় আয়ু ১০-১৫ বছর। এরা ৫-৭ ইঞ্ছি লম্বা হয়। এদের আদিনিবাস আফ্রিকা এবং মাদাগাস্কার। সারা পৃথিবীতে নয় জাতের লাভ বার্ড দেখা যায়। এর মধ্যে আট জাতের মূল আবাসস্থল আফ্রিকা এবং একটি জাতের মূল আবাসস্থল মাদাগাস্কার।যদিও এরা একটি বিদেশি প্রজাতি তবে বর্তমানে বাংলাদেশেও এদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে।
লাভবার্ডের আচরণঃ
লাভবার্ড অত্যন্ত চঞ্চল এবং প্রায়ই বিভিন্ন রকমের কাজে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করে। এদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আচরণ হলো উচ্চস্বরে চিৎকার করা। যদিও অনেকের কাছে এটি বিরক্তিকর মনে হতে পারে, লাভবার্ড প্রেমীদের কাছে এটি বেশ আনন্দদায়ক। এছাড়া, লাভবার্ড খুবই ভীতু প্রকৃতির। সামান্য শব্দ পেলেই এরা লুকানোর জন্য চেষ্টা করে এবং খাঁচায় হাড়ি বা বক্স থাকলে তার মধ্যে আশ্রয় নেয়। বসার ডাল, খেলনা ইত্যাদি চিবানো এদের অন্যতম প্রিয় কাজ।
লাভবার্ডের প্রজাতি এবং জাতঃ
পৃথিবীতে লাভবার্ডের মোট ৯টি প্রজাতি রয়েছে। এবং এদের অসংখ্য উপপ্রজাতি রয়েছে যা সম্পূর্ণরূপে উল্লেখ করা কঠিন। তবে আমাদের দেশে সাধারণত যেসব জাত বেশি দেখা যায়, সেগুলো হলো লুটিনো, রোজি ফেসড বা পিচ ফেসড, গ্রিন ফিসার, লুটিনো ফিসার, ইয়েলো ফিসার, চিকমাস্ক বা ব্ল্যাকমাস্ক, ব্লু মাস্ক, এবং বিভিন্ন ধরনের অপালিন। লাভবার্ড প্রধানত ২টি গোত্রে বিভক্ত। রিং বার্ড এবং নন রিং বার্ড। ফিসার গোত্রের যেকোনো পাখি রিং বার্ডের মধ্যে পড়ে, যেমন গ্রিন ফিসার, লুটিনো ফিসার ইত্যাদি। এছাড়া চিকমাস্ক, ব্লু মাস্ক, ভায়োলেট মাস্কের মতো মিউটেশনগুলিও রিং বার্ড। নন রিং বার্ডের মধ্যে যেকোনো অপালিন মিউটেশন, সাধারণ লুটিনো, পিচ ফেস বা রোজি ফেস উল্লেখযোগ্য।
বর্তমানে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে প্রজনন করে নতুন নতুন রঙের ও নামের লাভবার্ড জন্মানো হচ্ছে।লাভবার্ড তোতাপাখির চেয়ে অধিক জনপ্রিয়, কারণ তারা আকারে ছোট এবং দেখতে অত্যন্ত সুন্দর। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এদেরকে খুব অল্প জায়গাতেই পালন করা যায় তাই অনেকেই বাসায় পালন করে থাকে।
রিং লাভবার্ডঃ

রিং লাভবার্ডকে ফিসার লাভবার্ডও বলা হয়। এদের নাম এসেছে এদের চোখের চারপাশে থাকা সাদা রং এর বিশেষ রিং বা বলয়ের জন্য। এই প্রজাতির পাখিগুলি অত্যন্ত রঙিন এবং দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। চিকমাস্ক, ব্লু মাস্ক, কোবাল্ট মাস্ক, ইয়েলো কলার্ড, বিভিন্ন ফিসার গোত্রীয় লাভবার্ড যেমন – গ্রীণ ফিসার, ভায়োলেট ফিসার, ইয়েলো ফিসার, লুটিনো ফিসার এরা সবই রিং বার্ড।
নন রিং লাভবার্ডঃ

এদের চোখের চারপাশে কোনো রিং বা বলয় নেই। পিচ ফেস, লুটিনো পিচ ফেস, রোজি অপালিন ইত্যাদি মিউটেশনের লাভবার্ডই নন রিং। সাধারণত চোখের চারপাশের সাদা রং এর রিং বা বলয়-ই রিং এবং নন রিং বার্ডের মধ্যে প্রধান পার্থক্য, এছাড়া এদের মধ্যে আর তেমন কোনো পার্থক্য নেই।
হাইব্রিড লাভবার্ডঃ

একটি রিং বার্ড এবং একটি নন রিং বার্ডের মধ্যে প্রজনন ঘটলে যে বাচ্চা বের হয় তাকে হাইব্রিড লাভবার্ড বলে। এই বাচ্চা পরবর্তীতে আর ব্রিড করতে পারে না। তাই পাখি জোড়া দেওয়ার সময় এবং পাখি ক্রয় করার সময় এ বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে।
লাভবার্ড প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় খাঁচা এবং উপকরণঃ
লাভবার্ড সাধারণত ১০-১১ মাস বয়সে ডিম দেয়। এরা প্রতিবারে ৫-৬ টি ডিম দেয়। তবে কখনো কখনো ৮ টা ডিম পাড়তেও দেখা যায় কিন্ত তা খুবই কম। মেয়ে পাখি একাই ডিমে তা দেয়। ডিম দেওয়ার ২০-২৫ দিনের মধ্যে বাচ্চা বের হয় এবং প্রায় ৪০-৫০ দিন পর বাচ্চারা ব্রিডিং বক্স বা হাড়ি থেকে বের হয়।
বাসায় লাভবার্ড পাখি ব্রীড করাতে খাঁচার দৈর্ঘ্য কমপক্ষে ২৪ ইঞ্চি, প্রস্থ ২৪ ইঞ্চি, এবং উচ্চতা ১৮ ইঞ্চি হওয়া উচিত। এবং প্রতি জোড়া পাখির জন্য কমপক্ষে ৮x৮x৮ মাপের কাঠের বাক্স বা মাটির হাড়ি ব্যবহার করা ভাল।
প্রজননের জন্য পাখিকে বিশেষ যত্ন ও প্রাইভেসি দিতে হবে। খাঁচায় ব্রিডিং বক্স অথবা হাড়ি দিতে হবে। খাঁচায় পর্যাপ্ত নেষ্টিং ম্যাটেরিয়াল দিতে হবে যেন পাখিরা বাসা বানিয়ে ডিম পাড়তে পারে। তাছাড়া খাঁচায় খাবার এবং পানি পর্যাপ্ত থাকতে হবে। উল্লেখ্য যে ৬ ঘণ্টা পর পর পানি পরিবর্তন করে নতুন পানি দেওয়া ভাল। এতে পাখির রোগ বালাই হবার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। এছাড়া পাখিকে ব্রীডে দেবার আগে কৃমি কোর্স এবং ব্রিডিং কোর্স করিয়ে নেওয়া ভাল।
খাবারঃ
লাভবার্ড অল্প পরিমাণে খায় কিন্তু প্রচুর খাবার নষ্ট করে। লাভবার্ডের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরণের বীজ, তাজা ফল এবং সবজি থাকা উচিত। প্রোটিনের জন্য ডিমসিদ্ধ বা এগফুড দেওয়া যেতে পারে। এদের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন ও মিনারেল পরিমান মত রাখতে হবে।
- মিলেট, কাউন, চিনা, বারজা, তিসি, সূর্যমুখীর বিচি, কুসুম ফুলের বিচি, ধান, হেম্প সীড, বাকহুইট, ওটস ইত্যাদি।
- বিভিন্ন ধরনের ফল যেমন আপেল, বেদানা, পেয়ারা।
- শাকসবজি যেমন পালং শাক, কলমি শাক, বরবটি, ডেরশ, করল্লা, বাধা কপি, ফুলকপি, বিটরুট, গাজর ইত্যাদি।
- বিভিন্ন ধরনের ডাল, ভুট্টা ভাঙ্গা এবং গম।